খুলনা হার্ডবোর্ড মিলের ভাগ্য নির্ধারণ

বিগত আড়াই মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে খুলনা হার্ডবোর্ড মিলের। আর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ চলতি মাসসহ চার মাসের। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া ১০ কোটি টাকাও খরচ হয়ে গেছে। মজুদ রয়েছে মাত্র ৬০ হাজার পিস হার্ডবোর্ড। পূর্ব দর অনুযায়ী মজুদকৃত হার্ডবোর্ডের মূল্য দেড়
কোটি টাকা হলেও প্রস্তাবিত দর মোতাবেক মজুদকৃত হার্ডবোর্ডের মূল্য সোয়া তিন কোটি টাকা। এমন অবস্থায় যেমন মিলের হার্ডবোর্ড বিক্রি করা যাচ্ছে না, তেমনি নেই চলতি মূলধনও। আর চলতি মূলধনের অভাবে গত বছর ২৫ নভেম্বর থেকে মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডিলারদের পাওনা টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত হার্ডবোর্ড বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির জন্যও বিসিআইসি ও মিল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে উকিল নোটিশ। মজুদকৃত হার্ডবোর্ড বিক্রি করে চলতি মূলধনের যোগান দেয়া হলেও যেমন ডিলারদের টাকা বকেয়া থাকছে, তেমনি ডিলারদের পাওনা ৫০ লক্ষাধিক টাকার হার্ডবোর্ড পরিশোধ করা হলেও চলতি মূলধনের সংকট থেকে যাচ্ছে। এমন এক সংকটের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে খুলনার ঐতিহ্যবাহী হার্ডবোর্ড মিলটি। এ অবস্থায় বিসিআইসি নিয়ন্ত্রিত খুলনার হার্ডবোর্ড মিলটি আদৌ চলবে কি না তা’ নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। যে কারণে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আজ বৈঠকে বসছেন মন্ত্রী, স্থানীয় এমপিসহ আ’লীগ নেতৃবৃন্দ, মিল কর্তৃপক্ষ, সিবিএ ও ডিলার সমিতির নেতৃবৃন্দ। আজকের বৈঠকে বকেয়া প্রদানসহ ডিলারদের পাওনা বিষয়ক আলোচনা হলেও আগামীকালকের বিসিআইসির বোর্ড মিটিংয়েই হার্ডবোর্ডের ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে। অর্থাৎ কালকের বৈঠকেই মূলত  মিলটির বিএমআরই’র ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। বিসিআইসির বৈঠকে হার্ডবোর্ড মিলের বিএমআরইর বিষয়টি নাকচ হলে মিলটি চিরতরেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে বিএমআরই’র জন্য অর্থ যোগানের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে রক্ষা পাবে ঐতিহ্যবাহী এ মিলটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ফার্নেস অয়েলের অভাবে গত বছর ২৫ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১২টা থেকে হার্ডবোড মিলের উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। যদিও ওই সময় মিলে প্রায় ৭০ লাখ টাকার কাঠ মজুদ ছিল, যা’ এখনও রয়েছে। যা’ দিয়ে মিলটি অন্তত  ৬ মাস চালিয়ে রাখা যেত। কিন্তু ফার্নেস অয়েল না থাকায় ওই কাঠও আর কোন কাজে আসছে না।
মিলের উৎপাদন বন্ধের পর থেকে আর্থিক সংকট দূর করার জন্য বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন বা বিসিআইসির পক্ষ থেকে  ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে হার্ডবোর্ড বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু পূর্বের দেয়া ৫০ লাখ টাকার হার্ডবোর্ড পরিশোধ না করা পর্যন্ত নতুন করে বিক্রি না করার জন্য চাপ দেন ডিলাররা। এজন্য গত ১১ নভেম্বর ডিলারদের পক্ষ থেকে মিল কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ দেন খুলনার প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান প্রণেতা এ্যাড. মোঃ এনায়েত আলী। নোটিশে পূর্বমূল্যে হার্ডবোর্ড সরবরাহ অথবা ক্ষতিপূরণসহ অর্থ ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। ১০ কর্মদিবসের মধ্যে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেয়া হলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হলে প্রায় তিন মাস হতে চললেও জবাব দেননি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ডিলারদের পাওনার ব্যাপারে গত ২ ফেব্রুয়ারী শিল্পমন্ত্রী বরাবরে ৮ পৃষ্ঠার স্মারকলিপি দেয়া হয় খুলনা বিভাগীয় হার্ডবোর্ড ডিলার সমিতির পক্ষ থেকে। যাতে মিলটির বর্তমান দুরবস্থার জন্য মিল কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করা হয়। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে গত বছর ১০ কোটি টাকা দেয়া হলেও তা ‘অপচয়’ হয়েছে উল্লেখ করে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়। ওই পত্রে ৫ দফার সুপারিশ করা হয়। এগুলো হচ্ছে, জমাকৃত ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ফেরত দেয়া, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দেশীয় হার্ডবোর্ডকে টিকিয়ে রাখতে বার্ষিক লভ্যাংশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা, সুন্দরবনের আগামরা গাছের ডালপালা সরবরাহ করা, মিলে গ্যাস সংযোগ দেয়া এবং জরুরী ভিত্তিতে বিএমআরই করা।
এমনকি ওই পত্রে ১০ কোটি টাকা দেয়ার আগে ও পরের একটি তুলনামূলক চিত্রও দেয়া হয়। যাতে উল্লেখ করা হয়, আগে প্রতি পিস হার্ডবোর্ডের মূল্য ছিল ২৬২ টাকা এবং বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪০ টাকা। পূর্বে ১শ’ কেজি কাঠ থেকে ৭০-৮০ কেজি পাল্প তৈরি হলেও এখন হচ্ছে ৫০ কেজি। যা’ প্রতি একশ’ কেজিতে ২০-৩০ কেজি ঘাটতি। অপরদিকে মেইনটেন্যান্সের আগে ২৪ ঘন্টায় গড়ে ১৬শ’ থেকে ২ হাজার পিস হার্ডবোর্ড তৈরি হলেও এখন হচ্ছে মাত্র ৭শ’ পিস। এভাবে ১০ কোটি টাকা পাওয়ার পর ৫ কোটি টাকা দিয়ে মেইনটেন্যান্স করা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে এবং উৎপাদন কম হচ্ছে উল্লেখ করা হয়।
ডিলারদের এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান না করলেও বিএমআরই জরুরী বলে মনে করছেন মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রুহুল আমীন। তিনি বলেন, আগামীকাল মঙ্গলবার বিসিআইসি’র বোর্ড মিটিংয়ে বিএমআরই’র ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। বিএমআরই’র জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলেই মিলটি টিকবে নতুবা পরিস্থিতি কোন দিকে যায় বলা যায় না।
হার্ডবোর্ড এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ মশিউর রহমান ডাবলু বলেন, বিগত চারমাস ধরে শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছে না। এতে তাদের দিন চলছে অর্ধাহারে-অনাহারে। বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে তারা সম্প্রতি অবস্থান কর্মসূচী শুরু করলেও কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তা’ স্থগিত করা হয়। কিন্তু মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বৃহস্পতিবারের মধ্যে বকেয়া দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও তা’ পরিশোধ হয়নি। এসব বিষয় নিয়ে আজকের মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আলোচনা হবে। এজন্য তিনিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। বৈঠকে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ও খুলনা-৩ আসনের এমপি বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, খালিশপুর থানা আ’লীগের সভাপতি এসএম সানাউল্লাহ নান্নু, হার্ডবোর্ড ডিলার এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ আকতারুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক এস,এম মনির হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। বিসিআইসির পক্ষ থেকে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রুহুল আমিনও।
আজকের বৈঠকে ডিলারদের পক্ষ থেকে গত ২ ফেব্রুয়ারীর স্মারকলিপির বক্তব্য পুনঃউপস্থাপন করা হবে বলে জানান বিভাগীয় হার্ডবোর্ড ডিলার এসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম, শামসুল ইসলাম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, বর্তমান বাজার মূল্যকে উপেক্ষা করে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ হার্ডবোর্ডের যে মূল্য নির্ধারণ করছেন তাতে খুলনার ঐতিহ্যবাহী মিলটি ধ্বংস করারই শামিল। কেননা বর্তমানে আকিজ কোম্পানীর এ গ্রেডের পাইকারী মূল্য ২৭৫ টাকা, বি গ্রেডের মূল্য ২৫০ টাকা, সি গ্রেডের মূল্য ১৬০ টাকা, চায়না থেকে আমদানীকৃত হার্ডবোর্ডের মূল্য ২৪০ ও ২৬৫ টাকা, মালয়েশিয়ান এ গ্রেডের মূল্য ২৪০ টাকা এবং থাইল্যান্ডের হার্ডবোর্ডের বাজার মূল্য ৪৫০ ও ৫৫০ টাকা হলেও খুলনা হার্ডবোর্ড মিলের উৎপাদিত হার্ডবোর্ড ৫৪০ টাকা মূল্যে বাজারে চলবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, বন্ধ মিল চালু আর চালু মিল সচল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকার ৫ বছর পার করে আবার  ক্ষমতায় আসলেও এখনও খুলনাঞ্চলের মিলগুলোর দূুরবস্থা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বেদনাদায়ক। বিশেষ করে এশিয়ার বিখ্যাত কাগজকল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলটি যেমন চালু করতে পারেনি সরকার তেমনি দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরীও বন্ধ হয়েছে। আবার টেক্সটাইল মিলের মালামাল বিক্রি করে সাড়ে ৫ কোটি টাকা সরকার নিলেও টেক্সটাইল পল্লী আলোর মুখ দেখেনি। এভাবে উন্নয়ন বঞ্চিত খুলনা আবারও বঞ্চনার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর প্রতিকার হওয়া জরুরী বলেও তিনি মনে করেন।
Share this article :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. "আমার খুলনা" - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Blogger